কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কি ?

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস যা মারাত্মক বা সম্পূর্ণ বধির ব্যক্তিকে শব্দ শুনতে সাহায়তা করে। ইহা বায়োনিক ইয়ার নামেও অভিহিত। মারাত্মক বা সম্পূর্ণ বধির যারা উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন হিয়ারিং এইড ব্যবহার করেও ভালো শুনতে সক্ষম হয় না তাদের কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট প্রয়োজন হয়।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট অপারেশনের মাধ্যমে অন্তঃকর্ণের কক্লিয়াতে স্থাপন করতে হয়।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্টের দুটি অংশ থাকে। একটি অংশ কানের বাহিরে এবং অপর অংশটি কানের ভিতরে থাকে।

বাহিরের অংশে থাকে

  • মাইক্রোফোন
  • স্পিচ প্রসেসর
  • ট্রান্সমিটার কয়েল

ভিতরের অংশে থাকে

  • রিসিভার স্টিমুলেটর
  • ইলেকট্রোড

আমরা কিভাবে শুনি ?

মানুষের কানের তিনটি অংশ থাকে :

  1. বহিঃ কর্ণ
  2. মধ্য কর্ণ
  3. অন্তঃ কর্ণ

বাহিরের পরিবেশের শব্দ বহিঃকর্ণের মাধ্যমে সংগৃহীত হয়ে মধ্যকর্ণের পর্দার উপর পতিত হয়। উক্ত শব্দ মধ্যকর্ণের পর্দা এবং ক্ষুদ্র অস্থিগুলোর (ম্যালিয়াস, ইনকাস, স্টেপিস) কম্পনের মাধ্যমে অন্তঃকর্ণের কক্লিয়াতে প্রবেশ করে। কক্লিয়ার সাথে অডিটরী নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কের যোগাযোগ থাকায় শব্দগুলো ইলেকট্রিক্যাল সিগনালে রূপান্তরের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এবং আমরা তখন শুনতে পাই।

বিভিন্ন রোগে কক্লিয়া ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে মারাত্মক বধিরতা তৈরী হতে পারে। কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট অন্তঃকর্ণের ক্ষতিগ্রস্থ কক্লিয়াকে বাইপাস করে অডিটরী নার্ভকে উত্তেজিত করার মাধ্যমে শব্দকে মস্তিষ্কে পৌঁছাতে সাহায়তা করে।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কিভাবে কাজ করে ?

  1. বাহিরের পরিবেশের শব্দ প্রথমে মাইক্রোফোনের মাধ্যমে গৃহীত হয় এবং এনালগ ইলেকট্রিক সিগনালে পরিবর্তিত হয়।
  2. স্পিচ প্রসেসর উক্ত সিগনালকে প্রসেসিং করে কোডেড ডিজিটাল সিগনালে রূপান্তরিত করে।
  3. ট্রান্সমিটার কয়েলের মাধ্যমে উক্ত কোডেড সিগনাল রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে ইন্টারনাল রিসিভার স্টিমুলেটরে প্রেরিত হয়।
  4. রিসিভার স্টিমুলেটর উক্ত কোডেড সিগনালকে ইলেকট্রিক ইমপালসে পরিবর্তিত করে ইলেকট্রোডে প্রেরণ করে।
  5. ইলেকট্রোড উক্ত ইলেকট্রিক ইমপালসকে অডিটরী নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রেরণ করে এবং মস্তিষ্ক উক্ত ইমপালসকে শব্দ হিসেবে চিহ্নিত করে।

চিত্রের লেখা

  • ট্রান্সমিটার কয়েল
  • রিসিভার স্টিমুলেটর
  • লম্বা ইলেকট্রোড
  • স্পিচ প্রসেসর
  • কক্লিয়ার ইলেকট্রোড

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কাদের প্রয়োজন হয় ?

মারাত্মক বা সম্পূর্ণ শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশু বা বয়স্ক ব্যক্তি যারা উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন হিয়ারিং এইড ব্যবহার করেও ভালো শুনতে পায় না তারা কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট এর মাধ্যমে শ্রবণের জগতে প্রবেশ করতে পারে।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্টের সুবিধা কিসের উপর নির্ভর করে ?

যদিও সম্পূর্ণ প্রত্যাশিত ফলাফল পূর্বে থেকে অনুমান করা যায় না তথাপি নিম্নলিখিত বিষয়ের উপর কক্লিয়ার ইমপ্লান্টের প্রত্যাশিত ফলাফল কিছুটা নির্ভর করে।

  • জন্মগত বধিরদের ক্ষেত্রে ৫ বছর বয়সের পূর্বে বিশেষতঃ ২-৩ বছর বয়সে ইমপ্লান্ট করলে ভাল ফলাফল আশা করা যায়।
  • কথা শেখার পর যাদের শ্রবণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারা সাধারণত ভাল ফলাফল পেয়ে থাকে।
  • শ্রবণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরে কতদিন যাবত শ্রবণের জগত থেকে দূরে আছে।
  • পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের নিকট হতে যথার্থ সহায়তা ও অনুপ্রেরণা পেয়ে কিনা।
  • ইমপ্লান্ট পরবর্তী যথার্থ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার উপরও এর ফলাফল নির্ভর করে।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কাদের জন্য প্রযোজ্য নয় ?

  • সঠিকভাবে সংযোজিত হিয়ারিং এইড ব্যবহার করে যারা যথেষ্ট কথা বুঝতে পারে।
  • সাধারণত ৮ বছর বয়সের ঊর্ধ্বের জন্ম বধির শিশু যার পর্যাপ্ত অডিটরী প্রশিক্ষণ হয় নাই।
  • দীর্ঘদিন যাবৎ যাদের শ্রবণ স্নায়ু উত্তেজিত করা হয়নি।
  • যাদের শ্রবণ প্রতিবন্ধকতার কারণ কক্লিয়া ব্যতীত অন্য জায়গায় অবস্থিত।
  • যারা অবাস্তব ফলাফল আশা করে।
  • যাদের পারিবারিক অথবা বন্ধু-বান্ধবদের সহায়তার অভাব আছে।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারীর পূর্বে যে সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন

অডিওলজিক্যাল পরীক্ষা

  • Otoacoustic Emission (OAE)
  • BOA
  • PTA
  • Tympanometry
  • Aided Audiogram
  • ABR
  • ASSR
  • Speech Audiometry

রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা

  • CT Scan of Ear
  • MRI of Ear
  • সাইকোলজিক্যাল পরীক্ষা
  • জেনারেল এনেসথেসিয়ার উপযুক্ততার জন্য পরীক্ষাসমূহ

সুইচ অন এবং ম্যাপিং (Mapping)

সুইচ অন বলতে ইমপ্লান্টের বাহিরের অংশের স্পিচ প্রসেসরের সাথে সংযুক্ত ও চালুকরণকে বোঝায় এবং ম্যাপিং বলতে ইমপ্লান্টের বিভিন্ন চ্যানেলে শব্দ প্রবেশের পরিমাণ নির্ধারণকে বোঝায়।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারীর ২-৩ সপ্তাহ পর সুইচ অন এবং ম্যাপিং করতে হয়। যা অডিওলজিস্ট করে থাকে। যথার্থ শব্দ শোনার জন্য নিয়মিত ম্যাপিং করা প্রয়োজন হতে পারে।

হ্যাবিলিটেশন

ইমপ্লান্ট গ্রহণের পর গ্রহীতাকে শব্দ শোনা ও ভাষা শেখানোকে হ্যাবিলিটেশন বলা হয়।

জন্মবধির শিশুর ক্ষেত্রে হ্যাবিলিটেশনের সেশন কয়েক বছর ধরে চালাতে হতে পারে।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্টের জন্য কত ব্যয় হতে পারে?

বর্তমানে বিশ্বে পাঁচটি কোম্পানী কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট তৈরী করে। তার মধ্যে প্রধান তিনটি কোম্পানী হচ্ছে :

  1. Cochlear Limited (Australia)
  2. MED-EL (Austria)
  3. Advanced Bionics (USA)

একটি কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট করতে যে সকল ব্যয় হয় সেগুলো হচ্ছে :

  • ডিভাইসের মূল্য
  • পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ
  • হাসপাতালের খরচ
  • হ্যাবিলিটেশনের খরচ

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট ডিভাইসের মূল্য কোম্পানী ও মডেল ভেদে কিছু পার্থক্য থাকে। বাংলাদেশে একটি হাই-এন্ড কক্লিয়ার ইমপ্লান্টের দাম প্রায় ২০ লক্ষ টাকা এবং বেসিক টাইপ ইমপ্লান্টের দাম প্রায় ১০ লক্ষ টাকা। সরকারি হাসপাতালে অন্যান্য খরচের জন্য আরও প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাগতে পারে।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট টিম

এটি একটি টিমওয়ার্ক। টিমে থাকেন :

  1. ইএনটি সার্জন
  2. অডিওলজিস্ট
  3. স্পিচ থেরাপিস্ট / অডিটরি ভারবাল থেরাপিস্ট
  4. সাইকোলজিস্ট
  5. সমাজকর্মী

টিকা কাদের প্রয়োজন?

সাধারণত ৫ বছরের কম বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রে মেনিনজাইটিস প্রতিরোধের জন্য অপারেশনের পূর্বে টিকা দেওয়া প্রয়োজন হয়।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারী

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারী সাধারণত সম্পূর্ণ অজ্ঞান করে করা হয় এবং এতে ২-৪ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হয়। কক্লিয়ার ইমপ্লান্টের ভিতরের অংশ (রিসিভার স্টিমুলেটর) কানের পিছনে চামড়ার নিচে হাড়ে স্থাপন করা হয় এবং ইলেকট্রোড অংশ কক্লিয়ার ভিতরে স্থাপন করা হয়।

অপারেশন পরবর্তী অসুবিধা খুবই কম এবং রোগী সাধারণত ২-৩ দিন পর হাসপাতাল ত্যাগ করতে পারে।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারীর ঝুঁকি

অজ্ঞানজনিত সমস্যা, মেনিনজাইটিস, ফ্যাসিয়াল নার্ভ ইনজুরী, ইনফেকশন, টিনিটাস, ভার্টিগো ইত্যাদি হতে পারে। তবে এ জটিলতাগুলো কদাচিৎ দেখা যায়।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারীর পর গ্রহীতার প্রত্যাশা

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সব মানুষের জন্য সঠিক পছন্দ নাও হতে পারে। অভিজ্ঞ কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট টিম মূল্যায়ন করে প্রার্থীতা নির্ধারণে সাহায্য করবে। কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট গ্রহীতাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক শ্রবণ ফিরিয়ে দিতে পারে না। তবে একজন পূর্ণবয়স্ক গ্রহীতা কথোপকথন এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারবেন।

শিশুদের ক্ষেত্রে ফলাফলের তারতম্য হতে পারে। কিন্তু ইমপ্লান্টের উদ্দেশ্য হবে শিশুকে কথা বলা ও ভাষা শেখার দক্ষতা অর্জন করানো।

Specialist Surgeons

Prof. Dr. Md. Abul Hasnat Joarder

Prof. Dr. Nasima Akhtar

Dr. Kanu Lal Saha

Dr. Harun Ar Rashid Talukder (Yamin)

Audiologist

Mr. Mohammad Ariful Islam

Habilitationist

Hasiba Hasan Joya

Clinics

Hearing & Speech Solutions (HSS)

Tabassum International

CIPHA

Abid Hearing Instruments

SHONO BANGLADESH